Travelettes of Bangladesh
Empower women through traveling

দশভূজা : নারীর কলমে নারী (প্রথম) || চিৎকার



" বসির বসির..!!!"

দুই ডাকেই বুড়ো লোকটা হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলো। হাতজোড় করে নিচু মাথার সাথে কুঁজো পিঠটাকে আরো কুঁজো করে কাঁপা গলায় বললেন, " জ্বী স্যার। "

বিখ্যাত ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট আমান চৌধুরী টাইয়ের নট বাঁধতে বাঁধতে বললেন, " কোন রাজকার্যে ব্যস্ত থাকিস তুই ? এত কেন ডাকতে হয় ? "

বসির আলী কোলে পিঠে বড় করা মানুষটার সামনে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইলেন। দুই শব্দ বলে হাঁপিয়ে ওঠা এক দাঁতের ছেলেটা এখন জোর গলায় কত কথা বলছে..!!!

টাইয়ের নটটা পেঁচিয়ে গেছে, আমান সাহেব মুখ বিকৃত করে সেটা খুলে আবার ঠিক করতে করতে বললেন, " কথা বলিস না কেন ? বাইরে গিয়ে দেখে আয় হারামজাদাটা কি এখনো রাস্তায় বসে আছে ? "

বসির আলী শ্বেত পাথরে মোজাইক করা ঘরের মেঝের ওপর চোখ রেখে কাঁপা গলায় বললেন, " জ্বী স্যার "

গলা থেকে একটানে লাল রঙের টাইটা খুলে মেঝেতে ছুঁড়ে ফেললেন আমান সাহেব। " হারামজাদা কুত্তা..!!! দারোয়ানকে দিয়ে ভালোয় ভালোয় চলে যেতে বলসিলাম, হাজারবার করে বলে দিলাম ব্যাটা ঝামেলা করিস না। এখনো বসে আছে! কি চায় সে ? পঞ্চাশ হাজার টাকা অফার করলাম, ব্যাটা কানেই তুললো না। ফকিরের বাচ্চা, জীবনে পঞ্চাশ হাজার টাকা একসাথে দেখেছে কোনদিন.!! " চেহারাটা রক্ত উঠে লাল হয়ে গেছে, হাতদুটো জোর মুঠো করে ক্ষিপ্ত অজগরের মত ফুঁসছেন তিনি।

ড্রেসিংটেবিলে রাখা জার্মানী ফুলদানীটা তুলে আঁছড়ে ফেলে তিনি চিৎকার করে বললেন, " যা চলে যা আমার সামনে থেকে। সবগুলো ফকির এক জাতের হয়। দূর হো। "

বসির আলী অনেকগুলো বিশেষণ নিয়ে রান্নাঘরে ফিরে গেলেন। গ্যাসের চুলার ওপরে রাখা ননস্টিকের ফ্রাইং প্যানের ওপর লবণ ছিটাচ্ছিলেন মিসেস আমান চৌধুরী। বসির আলীকে ফিরতে দেখে বললেন, " কি হইসে চাচা? ভাঙচুরের শব্দ পেলাম। "

 

বসির আলী কিছু বললেন না, ওপরের তাক থেকে হলুদ গুঁড়োর কৌটোটা নামিয়ে দিলেন শুধু।

কৌটোটা নিতে নিতে শায়লা বললেন, " ড্রাইভার ভাই কি এখনো বসে আছেন রাস্তায়..??? "

বসির আলীলী মাথাটা নাড়লেন শুধু।

- গতকাল দুপুরের দিকে এসেছিলেন না..???

- জ্বী মা

খুন্তি নাড়ানোটা হঠাৎ থামিয়ে শায়লা থেমে থেমে বললেন, " মেয়েটা কোন হাসপাতালে চাচা..??? জানেন..??? "

" সরকারী হাসপাতালে মা, অবস্থা ভালো না নাকি। রক্ত দেওয়া লাগতেসে বার বার। " ভারী হয়ে যাওয়া কন্ঠে শেষ কথাগুলো শোনা গেল না ভালো করে। আহারে, চৌদ্দ বছরের বাচ্চা মেয়েটা বড্ড বাবা ন্যাওঁটা ছিল। প্রায়ই বাবার সাথে চলে আসতো এ বাসায়, বসির আলীকে বলতো নানাভাই আর শায়লাকে বড়োমা। কথা বলতো মাথার বেণীদুটো কেমন দুলিয়ে দুলিয়ে..!!!

- চাচা, আমি আপনাকে কিছু টাকা দেই, আপনি ড্রাইভার ভাইকে দিয়ে আসুন। মেয়েটার চিকিৎসায় লাগবে।

বসির আলী পাঞ্জাবির হাতাটা দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে বললেন, " টাকা নিবে না মা। বাইরে তো আর ড্রাইভার দাঁড়ায় নেই মা, একজন বাপ দাঁড়ায় আছে। "

মুখটা ফিরিয়ে খুন্তি নাড়ানোয় খুব ব্যস্ত হয়ে গেলেন শায়লা, দুচোখ ভর্তি করে পানি জমছে তার। তরকারির গরম ধোয়ার জন্য হয়তো।

- আপনার স্যার কি করেন..???

- খুব চিল্লাপাল্লা করছিলেন স্যার, আজগর এখনো দাঁড়ায়ে আছে শুনে।

" ও " শায়লা চুপ করে গেলেন। এ নিয়ে আর কথা বলতে ইচ্ছা করছে না। মেয়েটা হাসপাতালে মরছে, বাপটা রাস্তায় পা ছড়িয়ে বসে আছে বাড়িটার দিকে তাকিয়ে, কোন কথা নেই মুখে, শুধু তাকিয়ে আছে শুন্য দৃষ্টিতে, ছেলেটাকে গতকাল সন্ধ্যাবেলাতেই আমান পাঠিয়ে দিয়েছে চিটাগাং, তার চাচার বাড়িতে। পলিটিকালি নাকি খুব পাওয়ারফুল চাচা। ক্ষমতাবিহীন গরীব আজগরের সামর্থ নেই ঝামেলা করার তবু সাবধানের মার নেই। শায়লার এখন কিচ্ছুতে কিচ্ছু যায় আসে না। ছেলেটাকেও কেন জানি আপন আপন লাগছে না, মনে হচ্ছে না তিনি আদৌ এইই ছেলেটাকে চেনেন, কেমন যেন অপরিচিত। ফাঁকা মাথায় শুধু একটা জিনিষই ঘুরছে, তরকারিতে লবণ দিয়েছেন তো..!!!

বসির আলী ছানি পরা চোখে তাকিয়ে রইলেন শায়লার দিকে, জোর আঁচে পুড়তে থাকা তরকারি মেয়েটা প্রবল বেগে নাড়িঁয়েই যাচ্ছে খুন্তি দিয়ে। তরকারির পোড়া গন্ধে ভারি হয়ে গেছে রান্নাঘরের বাতাস, মেয়েটার সেদিকে কোন ভ্রুক্ষেপ নেই।

বড়ো ইচ্ছে করছে শায়লার মেয়েটার বাবার পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। আজগর মিয়া নিশ্চয়ই অবাক হয়ে তাকাবে। তখন শায়লা শান্ত গলায় বলবে, " আমিও ধর্ষণের বিচার চাই আজগর ভাই, আমিও তো তখন ১৬ বছরের বাচ্চা একটা মেয়ে ছিলাম। শুধু তফাত কি জানেন, আপনার মেয়ের মত আমি চিৎকার করতে পারিনি। বাসরঘরে নাকি চিৎকার করতে নেই, খুব লজ্জার ব্যাপার হয় তাহলে। "

Prapty Amlan Ichchha. 
MBBS 4th year (k72) 
Dhaka Medical College.